১ম বর্ষ,৫ম সংখ্যা,১৫ ই জুন ,২০১৪। ১লা আষাঢ়,১৪২১

১ম বর্ষ,৫ম সংখ্যা,১৫ ই জুন ,২০১৪। ১লা আষাঢ়,১৪২১

Thursday, May 15, 2014

আক্তারুজ্জামান বাপ্পির ছোট গল্প

ভুলের মাসুল

প্রতিদিনের মতো আজো মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আছে রাজু । খোলা চুল , গায়ের রঙ শুভ্র সাদা , চোখ দুটি টানা টানা, মনে হয় চোখ দুটিতে সবসময় চঞ্চলতা খেলা করে যা রাজুর অনেক ভাল লাগে ।। ইচ্ছে করে কথা বলতে তা আর হয়ে উঠে না ।। তার মতো নিন্ম মধ্যবিত্ত ছেলেদের জন্য ভালবাসা মানে বিলাসিতা ... তার বাবা গ্রামের এক স্কুল শিক্ষক ... অনেক কষ্ট করে তাকে লেখাপড়া শিখিয়েছে ... গ্রামে এস.এস.সি পাস করে শহরের একটি কলেজ এ ভর্তি হয়েছে … তাই দূর থেকে দেখেই চলে রাজু... আর মেয়েটা? মেয়েটার নাম ফারিহা ... বড়লোক বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান । ছোটবেলা থেকে যা চেয়েছে তাই পেয়েছে সে ... কোনদিন অভাব কি তা বুঝে নি ফারিহা ... প্রচণ্ড অহংকারী আর বদমেজাজি এই মেয়েটি ... কলেজ এর সব ছেলেরা এই মেয়েটি বললে জীবন দিতেও প্রস্তুত ।। বাজি ধরতে আর ছেলে ঘুরাতে সে ওস্তাদ ...
- দেখ দেখ আজো ক্যামন তাকিয়ে আছে ... মনে হয় তোর প্রেমে পরছে ।।
- এরকম ৮/১০ টা ছেলে প্রতিদিন আমার প্রেমে পরে আর উঠে ...
- তবে যাই বলিস ছেলেটা জোস ।। আমার সেই ভাল লাগছে ...
- হ আসলেই অনেক জোস ... কি সুন্দর একটা রংচটা শার্ট , ঢোলা প্যান্ট , চোখে চশমা আর মাথায় তেল লেপটে আঁচড়ানো ।। এ রকম পিস এই শহরে এই একটায় আছে , কি বলিস …
- এই আমার জান রে কিছু বলবিনা ।। আমি ওরে অনেক লাবু করি !!! হা হা হা
- এতো পিরিত ।। যা যা যাইয়া গলা ধইরা ঝুইলা পর ...
- চাইয়া থাকে তোর দিকে আর ঝুলমু আমি ...
- যা তোরে দিয়া দিলাম ।। এখন যাইয়া জান জান কর
- তবে যাই বলিস ছেলে টা অনেক সহজ সরল , বলদ টাইপের ... এক কথায় গ্রাম্য খেত
- এইসব গ্রাম্য খেত দের সাথে প্রেম কইরা মজা আছে ।। ইচ্ছা মত ঘুরানো যায়, যা বলে তাই শুনে , জীবন ও দিয়া দিতে পারে ।।
- তোর মতিগতি তো ভালো লাগতেছে না ।। তুই কি খেতের লগে প্রেম করবি নাকি ।।
- আরে দূর প্রেম না ।। একটু টাইম পাস করমু ।।

কাল রাতে রাজুর ঘুম হয়নি ... সারারাত বিছানায় গড়াগড়ি করেছে । রাতে ভালমতো খায়নি ।। তাই আজ সকাল সকাল কলেজ এ এসেছে কলেজ হোটেল এ নাস্তা করার জন্য , এখানে কম খরচে খাওয়া যায় ।। একটা টেবিল এ বসে পরল সে ।। রাজু দেখতে পেল ফারিহা হোটেল এ ডুকছে ... আজ ওকে আরও সুন্দর লাগছে ... নীল রঙের সালওয়ার কামিজ , চুল খোলা ... যেন নীল পরী ... ফারিহা এসে রাজুর টেবিল এ বসে পড়লো ।।
- হাই , আমি ফারিহা ... তুমি ?
- আমিইইই ...
- তোতলাচ্ছ কেন ... আমি কি বাঘ নাকি ভাল্লুক ...
- আমার নাম রাজু ...
- তোমাকে প্রায়ই দেখি আমার দিকে হা করে তাকিয়ে থাক ...
- কই নাতো ...
- মিথ্যা বলবে না একদম ... আমি সব দেখি, বুঝতে পারি ... তোমার কি আমাকে ভাল লাগে ...
- না না ... সত্যি বলছি আমি তাকাই না।।
- আচ্ছা তুমি না ।। আমি তাকাই থাকি , তোমাকে আমার ভাল লাগে ... তোমার মোবাইল নাম্বার টা দাওয়া যাবে
- আমার মোবাইল নাম্বার !!
- হা , তোমার মোবাইল নাম্বার
- নাও ********
- ধন্যবাদ ।। আমি তোমাকে ফোন দিবো ।। টা টা

শুরু হল রাজুর জীবনের এক নতুন অধ্যায় ... প্রতিদিন ফারিহার সাথে তার কথা হয় ।। কথা বলতে বলতে রাজু ফারিহাকে ভালবেসে ফেলে, ফারিহাকে বলার সাথে সাথে ফারিহাও রাজি হয়ে যায় ... কলেজ সময় এর বাইরেও তাদের দেখা করার পরিমাণ বেড়ে যায় , সেই সাথে বাড়তে থাকে রাজুর খরচের পরিমাণ ।। ফারিহাকে গিফট , খাওয়ানো , ঘুরতে যাওয়ার খরচের জন্য বাবার কাছে মিথ্যা বলতেও রাজুর বিন্দুমাত্র বাঁধে না ... রাজু ভাবে ফারিহাকে সে পেয়ে গেছে, জীবনে আর কিছু না পেলেও চলবে ... রাজুর ভুল ভাঙ্গতে বেশিদিন সময় লাগে না ।। ফারিহা তুচ্ছ কারনে রাজুর সাথে ব্রেকআপ করে ... রাজু ভেঙ্গে পড়ে তবে আশা ছেড়ে দেয় না।। প্রতিদিন ফারিহাকে বুঝাতে থাকে ।।রাতের পর রাত ফারিহার বাসার সামনে যেয়ে দাড়িয়ে থাকে ... একসময় ফারিহা বিরক্ত হয়ে যায় এবং রাজু কে বলে কাল কলেজ শেষে তুমি আর আমি আমার এক বন্ধুর বাসায় দেখা করব ... রাজু খুব খুশি হয় তার ফারিহা আবার তার জীবনে ফিরে আসছে ... পরদিন রাজু আর ফারিহা কলেজ শেষে দেখা করে ...
(পরেরদিন কলেজ এর ক্লাস এ )
- বদিউল ইসলাম রাজু কে ?
- জি আমি ...
- প্রিঞ্ছিপাল স্যার আপনাকে তার তার রুমে ডাকে ...
পিওনের পিছে পিছে রাজু স্যার এর রুমে যেয়ে ঢুকে ... দেখতে পায় ওখানে ফারিহা , তার কিছু বান্ধুবি, কলেজ এর কয়েক জন শিক্ষক ও আছে ... প্রথম কথাটি প্রিঞ্ছিপাল স্যার বলে ...
- তোমার নাম রাজু ?
- জী স্যার ।
- বাবা কি করে ?
- গ্রামের একটা স্কুল এর শিক্ষক ...
হঠাৎ ফারিহা বলে উঠে , স্যার এটাই সেই লম্পট , বাজে ছেলে যে আমার ইজ্জত হানি করতে চেয়েছিল এবং ছবি তুলছে ... আমি এর বিচার চাই ... রাজু শুনে অবাক হয়ে যায় এবং বলে বিশ্বাস করুন আমি এসবের কিছু জানিনা প্রিঞ্ছিপাল স্যার বলে তুই কিছু জানিস না তাই না, তাহলে এই ছবি গুলো কি ,বলেই স্যার কিছু ছবি রাজুর দিকে ছুড়ে মারে ... রাজু হাতে নিয়ে দেখতে পায় কালকে বিকালের কিছু ছবি ... রাজু বলে উঠে স্যার , আমার কথা একবার শুনেন ... তোর বাপ শিক্ষক না , শিক্ষক নামের কলংক ... যে এমন ছেলের জন্ম দিছে ... তোকে কলেজ থেকে বহিস্কার করা হল , প্রিঞ্ছিপাল স্যার বলে... রাজু কান্নায় ভেঙ্গে পরে এবং দেখতে পায় ফারিহার মুখে মিটিমিটি হাসি ... রাজু রুম থেকে বের হয়ে আসে ... সেদিনের পর থেকে রাজুকে আর কলেজ এ দেখা যায় না , দেখা যায় না শহরেও ... বেঁচে আছে নাকি মরে গেছে তাও কেউ জানে না ...

* * * * * * * *

ফারিহার মনে আজ অনেক আনন্দ ।। ৫ বছর প্রেম করার পর আজ তার মনের মানুষ ফাহিমের সাথে তার বিয়ে হতে যাচ্ছে ... ইশ ফাহিম টা যে কেনো এখনো আসছে না !! বাহিরে অনেক শব্দ শুনতে পাওয়া যাচ্ছে , নিশ্চয় ফাহিম এসেছে , ফারিহা মনে মনে বলে ... হঠাৎ ফারিহার রুমে হাসতে হাসতে ফাহিমের আত্মীয়রা ঢুকে পরে ... সবাই ফারিহাকে দেখছে , আজ ওকে অনেক সুন্দর লাগছে ... ফারিহার মা এসে বলে কি খালি ভাবিকে দেখলেই হবে , আমাদের ও একটু দেখেন ।। ফাহিমের মা বলে হা , বেয়াইন সাব চলেন , এই তোরা আয় ... ফাহিমের খালাতো বোন ঝুমকা বলে , খালা তোমরা যাও ... আমি ভাবির সাথে থাকি ... সবাই রুম থেকে বের হয়ে এল ... ঝুমকা ফারিহা কে বলে তোমার নাম আসিফা রহমান ফারিহা না? ফারিহা বলে , হা ... তুমি নীলপুর কলেজ এ পড়তে না।
ফারিহা বলে হা , তুমি কিভাবে জান ।। ঝুমকা বলে , আমিও ঐ কলেজ এ পড়তাম , তুমি বস আমি আসছি ...
ঝুমকা যেয়ে ফাহিম কে বলে ভাইয়া শোন , তোর সাথে আমার কথা আছে ... ফাহিম বলে কি বলবি, বল ।। ঝুমকা ফাহিম কে সব খুলে বলে ।। ফাহিম প্রথমে বিশ্বাস করতে চায় না... ঝুমকা অনেক বলার পর বিশ্বাস না করে পারে না ... ফাহিম ফারিহার রুমে এসে ঢুঁকে ...
- ফারিহা , তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে ...
- বল ফাহিম
- তুমি রাজু নামের কাউকে চিনো ...
- কই , নাতো ...
- মিথ্যা বলবে না ...
- হা চিনি ... ও আমার সাথে কলেজ এ পড়তো
- ছিঃ ফারিহা ছিঃ তুমি এত নীচ , দুশ্চরিত্রা ... আমি এটা কল্পনাও করি নি ...
- এসব তুমি কি বলছ ... বিশ্বাস কর তুমি যা ভাবছ তা কিছুই না।। ও আমাকে ভালবাসত ,আমি ওকে বাসতাম না ...
- ওহ ভাল ভাল , ভাল না বেসেই রুম ডেটে গিয়েছিলে ...
- ফাহিম বিশ্বাস কর ... আমি তোমাকে অনেক ভালবাসি ...
- তোর মতো মেয়ের ভালবাসা আমার দরকার নাই ... তুই একটা বেশ্যা , দুশ্চরিত্রা
বলেই ফাহিম রুম থেকে বের হয়ে যায় ... বাহিরে অনেক হট্টগোল শুনা যাচ্ছে ... ফারিহা শুনতে পায় ফাহিম বলছে , আমি এই মেয়েকে বিয়ে করব না ,মা চল ... ফারিহার মা ,বাবা সবাই কান্নায় ভেঙ্গে পরে ... ফারিহার মায়ের হঠাৎ ফারিহার কথা মনে পরে ।। সে দৌড়ে ফারিহার রুমে আসে ... দেখতে পায় ফারিহা বিছানায় ঘুমাচ্ছে ... তার মেয়েকে আজ অনেক সুন্দর লাগছে ... পায়ে কিছু একটার স্পর্শ পেয়ে ফারিহার মা সেটা হাতে নিয়ে দেখতে পায় সেটায় লেখা “বিষের বোতল”

আক্তারুজ্জামান বাপ্পি

No comments:

Post a Comment